অধ্যবসায় নিয়ে রচনা লিখন

অধ্যবসায় নিয়ে রচনা লিখন

অধ্যবসায় রচনা


ভূমিকাঃ

কেন পান্থ ক্ষান্ত হও,হেরি দীর্ঘ পথ 

উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ? 

- কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার 

এই দুনিয়ায় কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য  কাজ করতে গেলে সফলতা ও বিফলতা উভয় প্রকার ঘটনাই ঘটতে পারে।সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি হল অধ্যবসায়। জীবনচর্চা, লক্ষ্য অর্জন, অধ্যবসায়- এসব অনেকটা একই বিনিসুতোর মালায় গাঁথা।

অধ্যবসায় কিঃ

কোন কাজে সফলতা অর্জন করতে হলে ধৈর্য , পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও সহিষ্ণুতার মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন চেষ্টা করার নামই অধ্যবসায়।অধ্যবসায় হচ্ছে কতিপয় মানবিক গুণের সমষ্টি ।চেষ্টা,ধৈর্য,পরিশ্রম,আন্তরিকতা,সহিষ্ণুতা ইত্যাদি গুণের সমন্বয়ে অধ্যবসায় পূর্ণতা লাভ করে। জীবনের সব কাজেই প্রথমবার সফলতা আসে না।বার বার চেষ্টা করতে হয়। সাফল্য লাভের এই প্রয়াসের অপর নামই অধ্যবসায়। তাই তো কবি বলেছেন, 

পারো কি না পারো করো যতন একবার 

একবার না পারিলে দেখ শতবার।

অধ্যবসায়ের গুরুত্বঃ 

মানবসভ্যতার মূলে রয়েছে অধ্যবসায়ের এক বিরাট মহিমা। মানুষের জ্ঞান,বিজ্ঞান, শিল্পসহ নানা উদ্ভাবনে পৃথিবী বিকশিত হয়েছে। এইসব কিছুর মূলে অন্যতম নিয়ামক ছিল অধ্যবসায়। পৃথিবীর মানুষ অধ্যবসায়কে বেছে নিয়েছে বলেই মানবসভ্যতা বিকশিত হয়েছে। মানবসভ্যতার বিকাশ না হলে প্রাণীজগতের অন্যসব প্রাণের তুলনায় আমরা উন্নত হতে পারতাম না কখনোই। আসলে মানুষের অধ্যবসায়ের ইতিহাসই বর্তমান পৃথিবীর চিত্র। অধ্যবসায়ী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই কবি বলেছেনঃ

ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো! বাঁধো বাঁধো বুক,

শত দিকে শত দুঃখ আসুক আসুক। 

অধ্যবসায়ের উদাহারণঃ

জগতে যত বড় শিল্পী, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক ,ধর্মপ্রবর্তক রয়েছেন তাদের সবাই ছিলেন অধ্যবসায়ী। ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়েছে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মহাকবি ফেরদৌসি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে রচনা করেছিলেন অমর মহাকাব্য শাহনামা। আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই নিজের চেষ্টা ও সাধনায় দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে সংগ্রহ করেছিলেন দু হাজার প্রাচীন পুঁথি। যার ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ৪০০ বছরের অজানা ইতিহাস উদ্ভাসিত হয়। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস অধ্যবসায়ের আর এক জীবন্ত উদাহরণ। ইংরেজদের সাথে বার বার যুদ্ধে পরাজিত্ হয়েও তিনি দমে যাননি। বরং একনিষ্ঠ  অধ্যবসায়ের ফলে তিনি যুদ্ধে জয়ী হন। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্টাতা সম্রাট বাবর প্রাথমিক জীবনে পিতৃরাজ্য হতে বিতাড়িত হয়ে অসহায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। কিন্তু অদম্য অধ্যবসায়ের বলে সমগ্র ভারতের অধীশ্বর হয়েছিলেন। 

অধ্যবসায়ীর জীবনাদর্শঃ

জীবনসংগ্রামে সাফল্য লাভের অন্যতম বিষয় হল অধ্যবসায়। ইউরোপীয় প্রভাবশালী নেতা নেপোলিয়ন তার জীবনকর্মের মধ্যে রেখে গেছেন অধ্যবসায়ের অপূর্ব নিদর্শন। তার মতে, 

Impossible is a word , which is only found in the dictonary of fools. 

শুধু অধ্যবসায়ের বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ মনীষী বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন। 

ব্যক্তিজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্বঃ

ব্যক্তিজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব অপরীসীম। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই প্রতিভা ও সৃজনীশক্তি বিদ্যমান।মানবজীবনের এই সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করতে হলে অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই।

অধ্যবসায় ও প্রতিভাঃ

অনেকের ধারণা, অসাধারণ প্রতিভা ছাড়া কোন বড় কাজে সফলতা সম্ভব নয়। এই প্রসংগে বৈজ্ঞানিক নিউটন বলেছেন, 

আমার আবিষ্কারের কারণ প্রতিভা নয়,বহু বছরের চিন্তাশীলতা ও পরিশ্রমের ফলে দুরুহ তত্ত্বগুলোর রহস্য আমি ধরতে পেরেছি।

ডাল্টন স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,

 লোকে আমাকে প্রতিভাবান বলে, কিন্তু আমি পরিশ্রম ছাড়া কিছুই জানি না। 

ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের মতে, 

প্রতিভা বলে কিছুই নেই। 

ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্বঃ

ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব সর্বাধিক। অধ্যবসায় ব্যতীত কোন ছাত্র বিদ্যালাভে সফলতা লাভ করতে পারে না। এই প্রসংগে ড.শহিদুল্লাহ বলেছেন, 

কোন কাজ ধরে যে উত্তম  সেই জন

 হউক সহস্র বিঘ্ন ছাড়ে না কখন।

জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্বঃ

কোন সভ্যতাই একদিনে গড়ে উঠেনি। অধ্যবসায় দ্বারাই সভ্যতার বিকাশ সাধন হয়েছে, হয়েছে মানবজতির বিকাশ। অবিরাম অধ্যবসায়ের ফলেই আমরা চন্দ্র বিজয় করেছি, মহাশূন্যে পাড়ি দিয়েছি।তাই, জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। 

অধ্যবসায় ও উন্নত বিশ্বঃ

উন্নত বিশ্ব আজ সামাজিক ও সামষ্টিক অধ্যবসায়ের বলে সাফল্যের চরমে পৌছেছে। যুক্তরাষ্ট্র,কানাডা,জাপান ও চীনের শীর্ষ অবস্থানের পেছনে সামষ্টিক অধ্যবসায়ের অন্যতম ভূমিকা রয়েছে। 

অধ্যবসায় ও ধর্মঃ

পৃথিবীর জনপ্রিয় প্রত্যেক ধর্মগ্রন্থেই অধ্যবসায়ের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। অধ্যবসায়কে চারিত্রিক গুণ হিসেবে অনেক ধর্মগ্রন্থে দেখানো হয়েছে। 

অধ্যবসায় ও বাঙালিঃ

আমাদের দেশের একটি প্রচলিত প্রবাদ হলঃ

কাটা হেরি ক্ষান্ত কেন কোমল তুলিতে 

দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?

এই মর্মবাণী বাঙালি প্রায়শই মনে রাখে না। বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে নেই কোন অধ্যবসায়। বরং আছে শুধু বদরাগ, হুংকার, আস্ফালন ও নিজেকে প্রকাশ করার মিথ্যে বাহাদুরি।আমাদের অনেকের মধ্যে অধ্যবসায় নামক মহৎ গুণটি উপস্থিত না থাকার কারণে দিন দিন জাতি হিসেবে এবং মানুষ হিসেবেও অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে যাচ্ছি।

উপসংহারঃ

জীবনচর্চা ও সংগ্রামের অন্যতম সহায়কশক্তি অধ্যবসায়ের মত গুণটি আয়ত্ত্ব করতে না পারলে আমাদের জীবনবোধ থেমে যাবে। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য অধ্যবসায়ের পথেই হাটতে হবে। 

আমাদের সর্বোচ্চ সাফল্য 

অতীতেরগুলো নয়।

কারণ আমাদের নিয়তি

অপেক্ষা করছে সুদূর উচ্চতায়

 

এই পর্যন্ত ছিল অধ্যবসায় নিয়ে রচনা।আরো রচনা পড়তে চাইলে,

 মাদকাসক্তি ও এর প্রতিকার নিয়ে রচনা লিখন

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে রচনা 

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প নিয়ে রচনা লিখন

নিয়মানুবর্তিতা/শৃঙ্খলাবোধ নিয়ে রচনা 

সময়ানুবর্তিতা/সময়ের মূল্য নিয়ে রচনা লিখন



Next Post Previous Post