অ্যালান টিউরিং;কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক

অ্যালান টিউরিং;কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক

Alan Turing;founding father of artificial intelligence

এলান টিউরিং;নামটা যেন অন্ধকার চিলেকোঠার ঘরের মতো।যাকে মডার্ন কম্পিউটার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক বলা হয়।কিন্তু,এই লুকায়িত প্রতিভার মানুষটাকে অনেকেই এখনো চিনেনা।
একাধারে গণিতবিদ,দার্শনিক,কম্পিউটার প্রকৌশলী,দৌড়বিদ,ক্রিপ্টোলজিস্ট,যুক্তিবিদ ছিলেন তিনি।যার জন্যে ২য় বিশ্বযুদ্ধে ১৪ মিলিয়ন মানুষের জীবন বেঁচেছিল।আইনের নিষ্ঠুরতম কঠোরতায় চাপা পড়েছিল তার সমস্ত কীর্তি,গবেষণা।তিনিই সেই বিখ্যাত কিংবদন্তী অ্যালান ম্যাথিসন টিউরিং।
১৯১২ সালের ২৩ জুন ইংল্যান্ডের লন্ডনে এক মিলিটারি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।তার বাবা জুলিয়াস টিউরিং ছিলেন একজন ভারতীয় সিভিল সার্ভেন্ট।এক বড় ভাই সহ মা অ্যাথেল টিউরিং এর সাথে থাকতেন তিনি।ছোটবেলা থেকেই সবার চেয়ে আলাদা ছিল অ্যালেন।সারাদিন নিজে কাল্পনিক জগতে নিমগ্ন থাকতেন তিনি।
টিউরিং এর জন্মগতভাবে সামান্য তোতলামির সমস্যা ছিল।কথা বলার সময় কখনো অপ্রয়োজনীয় শব্দ তিনি ব্যবহার করতেন না।কিন্তু তিনি ছিলেন পাকা দৌড়বিদ।অনেক্ষণ কাজের পর যখন অবসর সময় পেতেন;তখন তার কাছে দৌড়ানোর ব্যাপারটা ক্লান্তি দুর করার বিষয় বলে মনে হতো।তাছাড়া তিনি বিভিন্ন দৌড় প্রতিযোগিতায় জয় লাভ করে রেকর্ড অর্জন করেছিলেন।
৬ বছর বয়সে সেন্ট মাইকেলস স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয় টিউরিং কে।শৈশব থেকেই সে সবকিছুকে সমীকরণে সীমাবদ্ধ করতে চাইতো।প্রকৃতির বিচিত্রতা তার মনে প্রশ্নের জাগরণ ঘঠাতো।এমনকি ছেলেবেলায় গাজর আর মটরশুটিকে একত্রে দেখে তিনি সেটাকে আলাদা করে ফেলেন।এবং বলতে থাকেন,এরা কখনোই এক হতে পারবে না,এদের ধর্ম আলাদা।১৯২৬ সালে শেরবর্ণ স্কুলে ভর্তি হন তিনি।
সেসময় ধর্মঘট চলার কারণে যানবাহন ছিল বন্ধ।কিন্তু টিউরিং স্কুলে যাওয়া বাদ দেননি।বাড়ি থেকে ষাট মাইল দুরে স্কুলে যান সাইকেল চালিয়ে।স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদটি চাপাও হয়েছিল।মাত্র ১৪ বছর বয়সে অ্যাডভান্সড ক্যালকুলাস শেষ করেন তিনি।ব্যতিক্রমধর্মী অ্যালেন তখন আইনস্টাইনের থিওরী নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
তিনি তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থায় ডুবে থাকাটাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতেন।তৎকালীন পাঠ্যপুস্তক পড়ার চেয়ে সৃজনশীল এবং স্বাধীন পড়াশোনা করতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন।যার কারণে স্কুলের প্রায় প্রতিটি ছাত্র এমনকি শিক্ষকদের কাছ থেকেও বিদ্রুপের শিকার হতে শুরু করেন।সেইসময় তার আত্মকেন্দ্রিক জীবনে আবির্ভাব ঘটে ক্রিস্টোফার মরকমের।একাকীত্বের এই খাপছাড়া ভালবাসাহীন জীবনে বন্ধু হয়ে আসে ক্রিস্টোফার।ক্রিস্টোফারের আগমনই তার জীবনের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে।ক্রিপ্টোলজি,জ্যোতির্বিদা সহ আরো অনেক কিছু সাথে প্রতিনিয়ত পরিচিত হতে থাকে টিউরিং।ধীরে ধীরে তার একমাত্র প্রাণপ্রিয় বন্ধুটিকে নিয়ে তার মনের দোলাচলেঅন্যরকম অনুভূতিরা বাসা বাঁধতে শুরু করে।ভালবেসে ফেলেন তিনি।কিন্তু তার এই নির্জীব,অপার্থিব ভালবাসায় ছেদ ঘটে ক্রিস্টোফারের মৃত্যু।টিউবারকুলেসিসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণপ্রিয় বন্ধুর এই অকাল মৃত্যু তছনছ করে দেয় টিউরিং এর মনোজগৎ।
বন্ধুর মৃত্যুর এক বছর পরে টিউরিং কিংস কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য ক্যামব্রিজে যান।একদিকে তথাকথিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অনাগ্রহ,আরেকদিকে খাপছাড়া একাকীত্বের ধোঁয়াশা জীবনে গণিত নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি।মাত্র ২২ বছর বয়সেই গণিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেন তিনি।সেই বছরই টিউরিং মেশিন এর প্রস্তাব করেন।তার প্রস্তাব ছিল,কোনো যন্ত্রকে যদি এলগরিদমের আওতাধীন করা হয়,তাহলে সেটার পক্ষে সকল গাণিতিক সমাধান সম্ভব।এজন্য.১৯৩৬ সালে সম্ভাব্যতা তত্ত্বে তাকে স্মিথ পুরষ্কার দেওয়া হয়।সেই সময় প্রস্তাবনাটি সেভাবে গ্রহণযোগ্যতা না পেলেও পরবর্তীতে তা সমগ্র বিশ্বের মনে আলোড়ন তুলে।
১৯৩৭ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার উপর পিএইচডি শেষ করেন তিনি।ঠিক ১৯৩৯ সালে ইতিহাসের নির্মমতম অধ্যায়গুলোর মধ্যে একটি শুরু হয়ে যায়।অর্থাৎ ২য় বিশ্বযুদ্ধ।তখন ব্রিটিশ মিলিটারী ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ একটি কোড ব্রেকিং দল গঠন করে।সারা ব্রিটেনের শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ,গণিতবিদ,দাবা খেলোয়াড়দের একত্রিত করে ব্লেচলী পার্কে স্থাপিত হয় Government Code and Cypher School.তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এনিগমা ভেঙে এর অর্থ বের করা।এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই এনিগমা কি?জেনে নেওয়া যাক-
এনিগমা হচ্ছে জার্মান সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত এমন এক যন্ত্র,যাতে কোনো সামরিক নির্দেশনাকে এনকোড করে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের কাছে প্রেরণ করা হতো রেডিও সংকেতের মাধ্যমে।সেইসব সংকেত কারো হাতে পড়লেও,সংকেতের অর্থ উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব ছিল তখনকারসময়ে।যদিও ১৯৩৮ সালে এনিগমার তথ্য উদ্ধারকারী বোম্বা নামক একটি যন্ত্র তৈরি হয়।কিন্তু জার্মানরা ২য় বিশ্বযুদ্ধে এনিগমাকে আরো উন্নত উপায়ে ব্যবহার করা শুরু করে।প্রতি চব্বিশ ঘন্টা পরপর জার্মানদের এনিগমা পরিবর্তন করতো তারা।যার কারণে তথ্য একদিনের উদ্ধার করা গেলেও পরেরদিনের জন্য সেটা আবার উদ্ধার করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে পড়ে।যার কারণে বোম্বা মেশিনটা অনেক বেশি অকার্যকর হয়ে পড়ে।
২য় বিশ্বযুদ্ধে টিউরিং প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে যুক্ত না হলেও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন।ব্লেচলী পার্কের সেই বিখ্যাত স্কুলে যোগদান করেন তিনি।এনিগমার গুপ্তসংকেত উদ্ধার করার কাজে ব্লেচলী পার্কে একটি দল কাজ করতো।প্রথম কয়েকমাস কাজ করার পরে সেই দলের অধিকাংশই নিরাশ হয়ে পড়তেন,টিউরিং ব্যতীত।তিনি তার অন্যান্য সহকর্মীদের মতো একঘেয়েমি কোড ব্রেকিং এর কাজ করতেন না।ফলস্বরুপ,১৯৩৯ সালের শেষদিকে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক যন্ত্রে প্রস্তাবনা নিয়ে হাজির হন টিউরিং।যা বোম্বার চেয়ে হাজারগুণ শক্তিশালী ছিল।তিনি বলেন যে,
"মানুষের দ্বারা এনিগমাকে হারিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।বরং একটি যন্ত্রের পক্ষেই সেটি সম্ভব।"
কিন্তু এই যন্ত্র বানানোতে অনেক অর্থের ব্যাপার আছে।সরকারের কাছ থেকে নেতিবাচক উত্তর পেতে পেতে একসময় বিরক্ত হয়ে যায় টিউরিং।সরাসরি রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে চিঠি লিখে আবদার জানায় টিউরিং।সাথে সাথেই কাজ হয়।টিউরিং এই নতুন যন্ত্রের নাম দেয় বোম্বে।বোম্বে বানানোরপর থেকে জার্মান সেনাবাহিনীর এনিগমা ভাঙা একদম সহজ হয়ে যায়।
ব্রিটিশ সরকার অবশ্য এ তথ্য জার্মানদের কাছে পৌছুতে দেয়নি।টিউরিং এবং তার দল ব্যতীত অন্য কারো কাছে এই তথ্য প্রকাশ হয়নি।সেজন্য অনেকবার নির্দিষ্ট জায়গায়,ব্রিটিশ জাহাজে হামলা হবে জেনেও সেখান থেকে জাহাজ,মানুষ সরিয়ে ফেলা হয়নি।এতে অনেক মানুষ মারা যায়।জেনেশুনে মানুষকে মরতে দেয়ার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার জন্য টিউরিংকে তাই ঠান্ডা রক্তবিশিষ্ট দানব বলে ডাকা হতো।তিনি দানব,মানুষ যাই হোক না কেন এলান টিউরিং না থাকলে ২য় বিশ্বযুদ্ধ যে কতটা ভয়াবহ ছিল তা বলার মতো নয়।তার বোম্বে মেশিনের কারণে প্রায় ১৪ মিলিয়ন মানুষের জীবন বেচে গেছে.১৯৪৬ সালে যুদ্ধে অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে Order of the British Empire উপাধি প্রদান করেন।উইনস্টন চার্চিলের ভাষ্যমতে,
"টিউরিং এর কারণেই ২য় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় দুই বছরের জন্য ছোট হয়ে এসেছে।"
১৯৩৯ সালে টিউরিং এর সাথে পরিচিত হয় জোয়ান ক্লার্ক।তার বোম্বে মেশিন তৈরির সম্পূর্ণ সময়টা তার সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে পাশে ছিল জোয়ান।তিনি ছিলেন একজন ক্রিপ্টোলজিস্ট এবং গণিতজ্ঞ।সেই সাথে কোড এনক্রিপ্টের কাজটা ভালই পারত।অবশেষে ১৯৪১ সালে তাদের এই পরিচিত হওয়া,বন্ধুত্ব সব প্রেমে রুপ নেয়।কিন্তু তাদের এই সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী ছিল না।টিউরিং এর ছেলেদের প্রতি আকর্ষণও ছিল,যার কারণে সে আর সম্পর্কে টিকিয়ে রাখতে চাইনি।
ছোটবেলা থেকেই টিউরিং দাবা খেলাতে পারদর্শী ছিলেন।তার এই নেশার মত ঝোকটাকে তিনি কাজে লাগান ১৯৪৮ সালে।তিনি তার এক সহকর্মীকে মানুষের সাথে দাবা খেলতে পারবে এরকম একটি পকম্পিউটার নিয়ে প্রোগ্রাম লিখেন।এছাড়াও ১৯৫০ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখেন তিনি।সেই গবেষণা থেকেই সৃষ্টি হয় টুরিং টেস্টের।যাকে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।বর্তমানে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় যে ক্যাপচা টেস্টের সম্মুখীন হয়,সেটা তো মূলত ওই টুরিং টেস্টেরই সম্মুখীন হওয়া।
টুরিং টেস্ট কাজের জন্য ১৯৫১ সালে টিউরিং রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন।কিন্তু এরপরেই তার জীবনে নেমে আসে ঘন কালো অন্ধকার।তছনছ হয়ে যায় তার ভিতরের হৃদয়টা,তার সারাজীবনের অর্জন।
১৯ বছরের একজন টেকনিশিয়ান আনর্ল্ড ম্যুরের সাথে টিউরিং এর সমকামিতার সম্পর্ক ছিল।মোটকথা,টিউরিং ছিল একজন হোমোসেক্সুয়াল।১৯৫২ সালে বিষয়টি যখন জানাজানি হয় টিউরিংকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়।তখনকার সময় ব্রিটেনে সমকামীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো।আর এই বিষয়টাই টিউরিং এতদিন সবার অজান্তে করে আসছিল।এমনকি জোয়ানের সাথে তার সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটে মূলত এই কারণেই।
আইনের আওতায় নিয়ে আসার পর তাকে দুটি শর্ত দেওয়া হয়।এক,তাকে জেলে যেতে হবে।দনাহয়,ইস্ট্রোজেন হরমোন সেবন করতে হবে।টিউরিং দুই নং শর্তটাই বেচে নেয়।তার অসমাপ্ত থাকা কাজ সম্পন্ন করতে নিজেকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে দুর্বল করতে শুরু করে টিউরিং।যার জন্য ২য় বিশ্বযুদ্ধে এত সাফল্য,তাকেই বহিষ্কার করা হয় সরকারী সবরকম সুবিধা থেকে।এ যেন নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা।
সকল কিছু থেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে তিনি জীবনটাকে আর বাচিয়ে রাখতে চাননি। ১৯৫৪ সালে আত্মহত্যা করেন তিনি।জানা যায়,তীব্র মাত্রার পটাশিয়াম সায়ানাইড সেবনের কারণে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় তার।
পরিশেষে,
টিউরিং যখন মারা যান,সাধারণ জনগণের কোনো ধারণাই ছিল না এই মহৎ মানুষটা তাদের জন্য কি কি করে গিয়েছে।তার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনেরশেষ মুহুর্তটুকুও আনন্দে বুকভরে নিঃশ্বাস নিয়ে মরতে পারেননি তিনি।সমাজের নির্মম আইনে কারাবন্দীর শিকার হয়ে ধুকে ধুকে মারা গেলেন।জীবন-মৃত্যু,ন্যায়-অন্যায় এর তীব্র দোলাচলে তিনি বেচে থাকতে পারেননি।সমকামিতার কারণেই যার এত বড় শাস্ত,সেই সমকামী মানুষগুলোকেপরবর্তীতে টিউরিং এর স্মরণার্থে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।তার স্মরণে ২০১৪ সালে মর্টেন টাইলডাম এর পরিচালনায় নির্মিত হয় দ্য ইমিটেশন গেইম।
এলান টিউরিং এর অবদান এত অসামান্য যে তার তুলনা করলে অন্যায় হবে।কেননা তিনি ছিলেন তার সমকক্ষদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে।তখনকার সময়ে না জন্মে তিনি যদি বর্তমান সময়ে জন্মাতেন তাহলে হয়তো একটি সুন্দর ,অবসাদহীন জীবন পেতেন।যতদিন পৃথিবীর মানুষ তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করবে,ততদিন টিউরিং এর নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
এই পর্যন্ত ছিল এলান টিউরিং নিয়ে। আরো পড়তে চাইলে,

Post a Comment

Please don't share any link.
© Bihongom . All rights reserved. Developed by Jago Desain