কাহলিল জিবরান;এক মোহমুগ্ধ বিস্ময়

কাহলিল জিবরান;এক মোহমুগ্ধ বিস্ময়

কাহলিল জিবরান


তুমি আমাকে বলেছো যে তুমি ভালবাসাকে ভয় পাও,কেন আমার ছোট্ট প্রিয়তমা,তুমি কি সূর্যের আলোকে ভয় পাও?তুমি কি সমুদ্রের ভাটার টান এবং প্রবাহকে ভয় পাও?আমি বিস্মিত হই কেন তুমি ভালবাসাকে ভয় পাও?
-কাহলীল জিবরান।

মানুষের ঠোঁটে সবচেয়ে মধুর শব্দটি হচ্ছে,মা।
কেউ বলে সুখ দুঃখের চেয়ে বড়,

কাহলীল জিবরান বা জিবরান খলিল জিবরান নামেই পরিচিত তিনি। ১৮৮৩ সালের ৬ই জানুয়ারি লেবাননের উত্তরে বাশারি শহরে এক মেরোনাইট খ্রিষ্টান পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।একাধারে চিন্তাবিদ,দার্শনিক,চিত্রশিল্পী এবং মুগ্ধতার কবি ছিলেন তিনি।যদিও পরবর্তীতে দার্শনিক পরিচয়টি প্রত্যাখান করেছিলেন তিনি।

তার বাবার নাম ছিল খলিল জিবরান।কিছুটা রুক্ষ স্বভাবের ও রক্ষণশীল হওয়ার কারণে সবাই তাকে ভয় পেত।মা কামিলেহ রাহমি কিন্তু পুরোপুরি ভিন্ন স্বভাবের।জিবরানের সাহিত্য,কবিতার প্রতি আকর্ষণ তার মায়ের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।রক্ষণশীল পরিবারে বিয়ে হওয়াসহ কিছুটা ধর্মীয় কারণবশত তার মায়ের আগ্রহ অনেকখানি বাধাপ্রাপ্ত হয়।কিন্তু তবুও তিনি মাঝে মাঝে গান গাইতেন,বিভিন্ন কিছু লিখতেন।মায়ের এই গুণটাই তাকে আকৃষ্ট করেছিল।মায়ের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা আর ভালবাসা ছিল।মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একবার তিনি বলেছিলেন-

 

পরিবারের একমাত্র কর্মজীবী বাবা যখন রাজনৈতিক ফাঁদে জেলে চলে যায় তখন অভাব অনটনের শেষ নেই।মা কামিলেহ তখন বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়।অভাব-অনটনের কারণে তার আর স্কুলে যাওয়া হয়নি।তাছাড়া মারিয়ানা,পিটার এবং সুলতানাসহ তার আরো তিন জন ভাই-বোন ছিল।স্কুলে না গেলে কি হবে;প্রকৃতি আর তার সৌন্দর্য্যের প্রতি জিবরানের গভীর আকর্ষণ ছিল।পরবর্তীতে যা তার সৃষ্টিশীলতায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।তার আঁকাআকিতে মুগ্ধ হয় বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ফ্রেড হল্যান্ড।তিনি জিবরানের স্বপ্নকে আরো একধাপ প্রশস্ত করে দেয়।

হঠাৎ করে ভাগ্য যেন অন্য রুপ দেখতে চাইলেন।তার সৃষ্টিশীল কল্পনার জগতে গভীরভাবে ছেদ পড়ে।যখন সে জানতে পারে তার বোন সুলতানার মৃত্যু।ঠিক তার পরের বছর ভাই পিটার মারা যায়,এবং একই বছর তার মাও ক্যান্সারে মারা যায়।কমসময়ে পরিবারের ৩ জনকে হারিয়ে বিধ্বস্ত শোকের সাগরে ভাসতে থাকে জিবরান।


কারো দাবি সুখের চেয়ে বড় দুঃখ;

আমি বলি এরা আলাদা না,

তারা একসাথেই আসে,

একজন তোমার মাথার কাছে থাকলে,

আরেকজন তোমার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে।

-কাহলীল জিবরান।

 

আধ্যাত্মিক মুগ্ধতার এই কবির জীবনে অনেক প্রেম ছিল।তিনি অনেক নারীকে ভালবেসেছিলেন।যার মধ্যে মে জিয়াদাহ,মেরি হাসকেল,সেলমা কারামি অনেকেই ছিলেন।

পরিবারের নিকটতম ব্যাক্তিদের মৃত্যুর পর শোকগ্রস্ত অবস্থায় জিবরানের সাথে দেখা হয় মেরি হাসকেলের।শোকগ্রস্ত জিবরান হৃদয়ের মধ্যে যেন আশার আলো দেখতে পায়। তার সফলতার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল হাসকেলের।উল্কার মতো হঠাৎ জিবরানের জীবনে প্রবেশ করেছিলেন হাসকেল,কিন্তু ধ্রুবতারার মতোই ধ্রুব হয়ে ছিলেন পরবর্তী জীবনে।ভালবাসার এমন উদারতা পেয়েছিলেন বলেই জিবরান নিজেকে খোঁজে পেয়েছিল।কিন্তু এই ভালবাসা পূর্ণতা আর অপূর্ণতার মাঝে শেকলবন্দী হয়ে থাকে।মধ্যকার কোনো এক শূন্যতা যেন তা পূরণ হতে দেয় না।তাদের নিখাদ ভালবাসার প্রমান পাওয়া যায় মেরির লেখা দিনলিপিতে এবং একে অপরকে দেয়া প্রেমপত্রে।জিবরানের ভাষায় মেরি ছিল জীবনদাত্রী,আর তার চিঠিগুলো তাকে জাগিয়ে দিয়েছে।মেরিকে লেখা জিবরানের চিঠি-

প্রিয় মেরি,

তোমার কাছে কাউকে বোঝার অসাধারন ক্ষমতা আছে।তুমি জীবনদাত্রী।তুমি মহান আত্মার মত যে কিনা শুধু কারও জীবন ভাগাভাগি করার জন্যই তার বন্ধু হয়না।বরং জীবনেও কিছু যোগও করে।তোমার সাথে আমার পরিচয় হওয়াটাই আমার দিনরাত্রির কাছে একটা বিরাট কিছু।এটা প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে এক অলৌকিক ঘটনা।

 

 

পরবর্তীতে মে জিয়াদাহ নামের একজন আরবী লেখিকাকে তিনি ভালবেসে পেলেন।তাদের মেলামেশায় মেরি ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে।তার "জেসাস" বইটি প্রকাশের পর থেকে তিনি নেশাগ্রস্ত হয়ে যান।একদিকে প্রেমিকার স্মৃতিকাতরতা,অন্য দিকে ভগ্ন স্বাস্থ্য যেন জীবনের শেষ দিন হয়ে দাড়িয়েছিল।

১৯৩১ সালে নিউইয়র্কে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।জিবরানের মৃত্যু হয় মাত্র ৪৮ বছর বয়সে।তার সৃষ্টিকর্মের বিশাল নিদর্শন তিনি উপহার দিয়ে গেলেন আমাদের।তিনি "দি প্রোফেট,ম্যাডম্যান,দি ব্রোকেন উইংস,স্যান্ড এন্ড ফোম,জিসাস" সহ আরো অনেক প্রতিভা রেখে গিয়েছিলেন।জিবরানের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম ছিল "দি প্রোফেট"। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত এই বই তার নিজেরই পরোক্ষ বহিঃপ্রকাশ।প্রেমিকা মেরির অনুপ্রেরণায় লেখা এই বই তাকে জগদ্বিখ্যাত করেছিল।"দি প্রোফেটে" এক মহাপুরুষের চোখে পৃথিবীর ঘটে যাওয়া গতানুগতিক বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে,যা আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার অন্তরালে চাপা পড়েছিল।

এবং প্রভু বললেন,তোমার শত্রুকে ভালবাসো।

অতঃপর আমি তাকে মান্য করলাম এবং নিজেকে ভালবাসলাম।

-কাহলীল জিবরান।

 

 

"দি ব্রোকেন উইংস" নামে খ্যাত বইটি তার আর প্রেমিকা সেলমাকে নিয়ে।এই বই নিষ্ঠুর বাস্তবতা আর মুক্ত প্রেমের।তার লেখা যেন মন্ত্রযুগ্ধ করে ফেলে পাঠককে।আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার নিষ্ঠুর বিচ্ছিন্নতা তিনি প্রকাশ করেছেন এই বইয়ে।

ভালবাসা হল একটা অচঞ্চল প্রার্থনা সংগীত,যা রাতের নিরবতার ভেতরে শোনা যায়।এবং যেখানে ধোঁয়াশা ও সবকিছুর জন্য রয়েছে নির্যাস।

-কাহলীল জিবরান।

 

 

ক্ষণজন্মা এই বিস্ময় মানবসভ্যতাকে তার জ্ঞানভান্ডার থেকে সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন,প্রতিদানে কিছুই চাননি।ভগ্ন হৃদয় আর এক বুক হতাশা নিয়ে তিনি হারিয়ে গেছেন।তার মোহমুগ্ধকর কবিতা যেন চিরাচরিত প্রেমের ভিন্ন সংজ্ঞা।জিবরানের কবিতার উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো-ভৌগোলিক বিচরণের ক্ষেত্রে সময়হীনতা এবং মরমী দার্শনিকের এক অবাস্তব জগৎ।বিয়ে,প্রেম,জীবন ইত্যাদি নিয়ে তার অনূভুতি প্রকাশ পেয়েছে অন্যরকম মাত্রা নিয়ে।তিনি আধুনিক বস্তুবাদী জগতে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় সীমানার বাইরে থেকেও আধ্যাত্মিকতাকে তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সফলভাবে। মনের অবোধ্য কথাকে তিনি কাগজের মধ্যে প্রতিস্থাপন করেছেন।তার লেখা সাহিত্যের অসাধারণত্ব যেন হারিয়ে দেয় বর্তমানের সব বিষাদকে।

তার কবরের এপিটাফে নিজের ইচ্ছামতো লেখা আছে,

আমি তোমাদের মতো বেঁচে আছি এবং তোমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছি।চোখ বন্ধ করে চারদিকে অনুভব করার চেষ্টা করো,আমাকে খুঁজে পাবে।




Read More:

মেরি শেলি;অন্তরালে লুকিয়ে থাকা আলোকবর্তিকা
কাহলিল জিবরানের বিখ্যাত উক্তিসমূহ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনী
বেগম রোকেয়া জীবনী
চারুলতা;সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি
এলিজাবেথকে লেখা রবার্ট ব্রাউনিং এর প্রেমের চিঠি
মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি;মনুষ্য হৃদয়ের কাঙ্ক্ষিত কথক