পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার নিয়ে রচনা লিখন

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার  নিয়ে রচনা লিখন

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

ভূমিকা:

সভ্যতার সূচনালগ্নে পৃথিবীতে পরিবেশ ছিল মানুষের অনুকূলে। বায়ুমন্ডলে ছিল প্রাণের বন্ধু - অফুরন্ত অক্সিজেন; খাদ্য ও পানিতে ছিল সতেজ বিশুদ্ধতা ও পুষ্টি। আর এসবের প্রভাবে মানুষ হয়ে উঠল দ্রুত উন্নত মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রাণী। তাই সে জীবনযাপনকে আরো উন্নত ও সুন্দর করার প্রত্যাশায় প্রকৃতির উপর চালায় কুঠারাঘাত, আবিষ্কার করে নতুন নতুন জিনিষ।এইসব অতিমাত্রিকতায় পরিবেশে নেই এখন পূর্বের মতো বিশুদ্ধতার প্রতিশ্রুতি। তাই আজ কবির পরম আকুতি:

দাও ফিরে সে অরণ্য 

লহ এ নগর

পরিবেশের স্বরূপ:

পরিবেশ হল হলো প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার সংমিশ্রণে গঠিত একটি এলাকার সামগ্রিক চিত্র।ঘরবাড়ি, দালান -কোঠা, নদী- নালা, পাহাড়-পর্বত,  গাছপালা তথা সবকিছুর সামষ্টিক অবস্থাই পরিবেশ।

পরিবেশ দূষণ:

'পরিবেশ' ও 'দূষণ' শব্দ দুটির সমন্বয়ে 'পরিবেশ দূষণ' ধারণাটি গঠিত। দূষণ হচ্ছে এমন কিছু যা স্বাভাবিক অবস্থাকে বিঘ্নিত করে। আর পরিবেশ দূষণ হচ্ছে প্রাকৃতিক ব্যবস্থার এক বা একাধিক অবস্থার বিঘ্নিত রুপ।

পরিবেশ দূষণের সূত্রপাত:

মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে পরিবেশ দূষণের সূত্রপাত ঘটে।সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুষ যখন প্রথম আগুন আবিষ্কার করে সেদিন থেকেই অক্সিজেনের ধ্বংসলীলা শুরু হয়। ধোঁয়া আর ছাইকণায় কলুষিত হতে থাকে পরিবেশ।কিন্তু পরিবেশের এই দূষণ প্রয়োজনের তুলনায় ছিল খুবই সামান্য।এই পরিবেশ দূষণ দ্রুততর ও তীব্রতর রূপ লাভ করে ইউরোপে ঘটিত শিল্পবিপ্লবের ফলে।

পরিবেশ দূষণের কারণ:

পরিবেশ দূষণের নানা কারণ বিদ্যমান। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

১.জনসংখ্যা বৃদ্ধি

২.বনভূমি উজাড়করণ

৩.বায়ূ দূষণ

৪.পানি দূষণ

৫.তেজস্ক্রিয় দূষণ

৬.রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার:

৭.বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার:

৮.গ্রিন হাউজ এফেক্ট

৯.আর্সেনিক দূষণ 

১০. মাটি দূষণ


জনসংখ্যা বৃদ্ধি:

পরিবেশ দূষণের অসংখ্য কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণটি হলো জনসংখ্যা বৃদ্ধি। প্রতি মুহুর্তে জনসংখ্যা বেড়েই চলছে।কিন্তু বাড়ছেনা প্রাকৃতিক সম্পদ। বাড়তি জনসংখ্যার জন্য বাড়তি  যাতায়াত, বিনোদন, আশ্রয়সহ নানা সুযোগ সুবিধা বাড়াতে মানুষ নির্মভাবে ধ্বংস করে চলছে প্রাকৃতিক সম্পদ।যা পরিবেশের ভারসাম্যকে দারুণভাবে বিনষ্ট করছে।

বনভূমি উজাড়:

নির্বিচারে বনভূমি উজাড়ের ফলে ব্যপকভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।সারাবিশ্বে প্রতিনিয়ত বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। ফলে অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিশাল অংশ মরুময় হয়ে যাচ্ছে।

বায়ূ দূষণ:

বায়ু আমাদের একটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ, যা প্রতিনিয়ত নানাভাবে দূষিত হচ্ছে।যানবাহনের জ্বালানি, শিল্প প্রতিষ্ঠানের জ্বালানি, ইটের ভাটার জ্বালানি ইত্যাদি কারণে বায়ুর সাথে নানা ক্ষতিকর পদার্থ মিশে সামগ্রিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পানি দূষণ:

পানির অপর নাম জীবন, যদি তা বিশুদ্ধ পানি হয়। কিন্তু এই পানি নানাভাবে দূষিত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও জলযানের বর্জ্য পানিতে মিলিত হয়ে পানি দূষণ ঘটাচ্ছে।অধিকাংশ শিল্প কারখানা নদীর তীরে স্থাপন করা হয়। এইসব কারখানার বর্জ্য সোজা নদীতে পতিত হয়। এছাড়া উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর সমুদ্রে  হাজার হাজার টন রাসায়নিক বর্জ্য ফেলে থাকে। কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানির সাথে মিশে গিয়ে পানি দূষণ ঘটায়।

তেজস্ক্রিয় দূষণ:

বর্তমান বিশ্বে চলছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও শক্তির উন্মত্ততা।বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো একের পর এক নতুন অস্ত্র তৈরি করছে, সেগুলো পরীক্ষাও করছে। ফলে তেজস্ক্রিয় দূষণ সংঘটিত হচ্ছে।তাছাড়া পারমাণবিক দুর্ঘটনার ফলে সেখানকার পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।যেমন: ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল পারমাণবিক দূর্ঘটনা।

রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার:

রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। কেননা,  এইসব রাসায়নিক সার বৃষ্টির পানির সাথে মিশে পার্শ্ববর্তী জলাশয়ে পতিত হয়। ফলে পানি দূষণ ঘটে। জলাশয়ের মাছগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার: 

পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী ক্ষতিকর পদার্থগুলো হচ্ছে সীসা, পারদ, সালফার ডাই অক্সাইড ও কার্বন মনো অক্সাইড ইত্যাদি।এইসব পদার্থের ব্যবহার পরিবেশকে মারাত্মক ভাবে দূষিত করছে।

গ্রিনহাউজ এফেক্টঃ

গ্রিনহাউজ গ্যাস বলতে কাঁচের ঘেরা ঘরকে বোঝায়।কাঁচের ঘেরা ঘরে সূর্যের কিরণ সহজে প্রবেশ করে, কিন্তু ভেতর থেকে বিকিরণ কাঁচ ভেদ করে বাইরে  আসতে পারেনা। ফলে গ্রীন হাউজের ভেতরের উত্তাপ বৃদ্ধি পায়। তেমনি একই ভাবে সূর্যরশ্মি পৃথিবীর বায়ুমন্ডল ভেদ করে পৃথিবীপৃষ্ঠে সহজে পৌছে, কিন্তু  পৃথিবী থেকে সব বিকিরণ সহজে মহাকাশে যেতে পারে না।ফলে বায়ুমন্ডলের উত্তাপ বৃদ্ধি পায়।এখানে কাচ হিসেবে কাজ করে বিভিন্ন প্রকার গ্যাস। যেমন: কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, সিএসপি ইত্যাদি।

মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বিশেষত, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত দহন এবং বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে প্রাকৃতিক গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া তীব্রতর হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আর্সেনিক দূষণ:

আর্সেনিক দূষণ অত্যন্ত ভয়াবহ দূষণ। আর্সেনিক ও তার দ্রবণীয় যৌগ মিলে সাংঘাতিক বিষ সৃষ্টি করে,  যা ক্যান্সারের বাহক।

মাটি দূষণ:

অপরিকল্পিত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্প আবর্জনা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক,  খনিজ আবর্জনা ইত্যাদি মাটি দূষণের জন্য দায়ী, যা পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।তা ছাড়া পলিথিন ও প্লাস্টিক মাটি দূষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পরিবেশ দূষণের প্রতিকার:

পরিবেশ দূষণের পরিণাম খুবই ভয়াবহ।জনসাধারণ পরিবেশ দূষণ ও তা রোধ সম্পর্কে সচেতন থাকলে পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

পরিবেশ দূষণ রোধের উপায়:

১. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। 

২.শিল্প এলাকা নির্দিষ্টকরণ।

৩.শিল্পবর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ।

৪. ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণ।

৫.বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা।

৬.উপকূলীয় বনভূমির প্রসারণ করা।

৭.কাঠের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করা।

৮.পরিবেশ সম্পর্কে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

৯.সমুদ্রে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধকরণ।

খাদ্যচক্র ও পরিবেশ দূষণ: 

পরিবেশ দূষণের ফলে আমাদের খাদ্যচক্রে প্রতিদিন সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। খাদ্যের ব্যাপারে জীবজগৎ  একে  অন্যের উপর নির্ভরশীল।যেমন: পোকামাকড় ময়লা আবর্জনা খায়।ছোট মাছ পোকামাকড় খায়।বড় মাছ ছোট মাছকে খায়।বিভিন্ন পাখিও মাছ খায়।মানুষ পাখি ও মাছের মাংস খায়।মানুষ বিভিন্ন ফসলাদি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে।বর্তমানে অধিক ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে জমিতে বিভিন্ন রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। এভাবে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

পরিবেশ দূষণ ও ওজোন স্তরের ক্ষয়:

পরিবেশ দূষণের বহুবিধ দিকের মধ্যে ওজোনস্তরের অবক্ষয় ও তার ফলে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া অন্যতম।ওজোন স্তরটি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে পৃথিবীর প্রাণীজগৎকে।পরিবেশ দূষণের ফলে ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

পরিবেশ ও বৃক্ষ:

পরিবেশের উপর বৃক্ষের প্রভাব অপরিসীম।কারণ, কেবল বৃক্ষই পারে পৃথিবীর সব বিষাক্ত গ্যাস হজম করে পৃথিবীকে রক্ষা করতে।এছাড়া এক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা দিয়েছে, এক হেক্টর বনভূমি প্রতি বছর প্রায় একশ টন ধুলো -ময়লা পরিশোধন করে এবং মানুষকে প্রায় ৩০ টন অক্সিজেন উপহার দেয়।সুতরাং পরিবেশের উপর বৃক্ষের প্রভাব অপরিমেয় ও অনস্বীকার্য।

নদী ভাঙন ও পরিবেশ দূষণ:

নদী ভাঙনের ফলে নদীর তীরে থাকা গাছপালার ধ্বংস সাধন হয় ।ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পরিবেশদূষণ ঘটায়।

পরিবেশ দূষণ ও ইটের ভাটা: 

ইটের ভাটা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে পরিবেশকে রক্ষার জন্য ১৫০ ফুট উঁচুতে চিমনি স্থাপন করা নিয়ম।কিন্তু বেশিরভাগ ভাটার চিমনির উচ্চতা ৪০ হতে ৫০ ফুট।ফলে বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ।

পরিবেশ দূষণ ও পলিথিন:

পলিথিন হলো অবিনাশী।পলিথিন মাটির সাথে মিশে  যায় না, পচে না, নষ্ট হয় না। এমনকি আগুনে পোড়ালে ছাই হয় না। এভাবে পলিটিন মাটির উর্বরতা নষ্ট করে দেয়।পলিথিন ব্যাগে খাদ্যদ্রব্য রাখলে অতি সূক্ষ 'ট্রেস এসডিন্ট' নামক বিষ খাদ্যেদ্রব্যে মিশে যায়।তা পাকস্থলিতে জমে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি করে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস:

পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধকল্পে জাতিসংঘ প্রতিবছর ৫জুন 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস ' পালন করে।বিশ্বে পরিবেশ কীরুপ দূষিত হচ্ছে সে সম্পর্কে মানুষকে অবহিত ও সচেতন করাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের লক্ষ্য।বিশ্ব পরিবেশ দিবসের স্লোগান হল: 

আর পরিবেশ দূষণ নয়,

চাই পরিবেশ বিশুদ্ধিকরণ

পরিবেশ দূষণ ও বাংলাদেশ:

পাশ্চাত্য সভ্যতার হাত ধরেই বাংলাদেশেও পরিবেশ দূষণের ব্যাপকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।চারদিকে গজিয়ে উঠছে শিল্প নগরী।পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণ ক্রমাগত বেড়েই চলছে।ঢাকা এখন বিশ্বের সবচেয়ে বায়ুদূষিত নগরী।

উপসংহার:

জীবন ও পরিবেশ অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত।সুস্থ জীবনের জন্য সুস্থ পরিবেশ অপরিহার্য। কিন্তু পরিবেশ দূষণ ধীরে ধীরে ষোলকলায় পূর্ণ হতে যাচ্ছে, যা মানব অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরুপ।প্রাণঘাতী পরিবেশ দূষণের হিংস্র থাবার করাল গ্রাস থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা আমাদের অঙ্গীকার হোক।

এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি 

নবজাতকের কাছে এ আমার অঙ্গীকার

-সুকান্ত ভট্টাচার্য 



এই পর্যন্ত ছিল পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার  নিয়ে রচনা লিখন। আরো রচনা পড়তে চাইলে,

 মাদকাসক্তি ও এর প্রতিকার নিয়ে রচনা লিখন

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে রচনা 

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প নিয়ে রচনা লিখন

নিয়মানুবর্তিতা/শৃঙ্খলাবোধ নিয়ে রচনা 

সময়ানুবর্তিতা/সময়ের মূল্য নিয়ে রচনা লিখন



Next Post Previous Post